তাফিদা রাকীবের বেঁচে থাকার আশা ব্রিটিশ চিকিৎসকরা যখন খারিজ করে দিয়েছিলেন, তখন মেয়েকে ইতালি নিয়ে যেতে হাই কোর্টে ঐতিহাসিক এক জয় পান তার মা-বাবা। 

মস্তিস্কে আঘাত পাওয়া তাদের চার বছরের সন্তানের আয়ু আর বেশিদিন নেই, ব্রিটিশ চিকিৎসকদের এমন ভবিষ্যৎবাণী তারা মেনে নিতে পারেননি।

যুক্তরাজ্যের দৈনিক ডেইলি মেইলের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, আরোগ্যের সম্ভাবনা নাকচ করা অন্ধকার সেই পূর্বাভাস উপেক্ষা করে আড়াই বছর পরও ইতালির একটি হাসপাতালে বেঁচে আছে তাফিদা।

তার মা-বাবা এখন চাইছেন, তাদের মতো দুর্ভোগে পড়া অন্য পরিবারগুলোকেও রক্ষা করতে।

ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগে মস্তিস্কে আঘাত পাওয়া যেসব শিশু ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসেস (এনএইচএস) এর চিকিৎসা পায় না, তাদের জন্য ২৫ কোটি পাউন্ড ব্যয়ে যুক্তরাজ্যে একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র করতে চান তারা।

তাফিদার পরিবার জানিয়েছে, ইতোমধ্যে তাদের তহবিলে ২০ লাখ পাউন্ড জমা হয়েছে। এই প্রকল্পে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদেরও সহায়তা রয়েছে।    

২০১৯ সালে স্কুল পড়ুয়া হাসি-খুশি আর সুস্থ সবল চার বছর বয়সী তাফিদা হঠাৎ করে পড়ে গেলে মস্তিস্কের রক্তনালী ফেটে যায়। সে কোমায় চলে গেলে লন্ডনের তিনটি হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। পরে র‌য়্যাল লন্ডন হসপিটালের পক্ষ থেকে জানানো হয় শিশুটির আর বেঁচে থাকার আশা নেই।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মৃত্যু হবে জানিয়ে ওই বছর বসন্তে এনএইচএস যখন হাই কোর্টে তার লাইফ সাপোর্ট মেশিনটি বোতাম চেপে বন্ধ করে দেওয়ার অনুমতি চায় তখনও জীবন-মৃত্যুর মাঝে দুলছিল তাফিদার জীবন।

কিন্তু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক তার মা আইনজীবী সেলিনা বেগম এবং বাবা নির্মাণ কাজের পরামর্শক মোহাম্মদ রাকীব তা মেনে নিতে পারেননি। মেয়ের জীবন রক্ষার আবেদন জানিয়ে আদালতে বলেন,তাদের উপস্থিতিতে মেয়ে সাড়া দিয়ছে।

পর ২০১৯ সালের অক্টোবরে যুগান্তকারী রায়ে তাফিদার পরিবারের পক্ষে দাঁড়ায় আদালত। এনএইচএস এর আবেদন নাকচ করে ‘পবিত্র জীবনের’ উল্লেখ করে শিশুটিকে বাঁচানার সুযোগ দেন বিচারক ম্যাক ডোনাল্ড।

এরপর তাফিদাকে জেনোয়ায় গ্যাসলিনি চিলড্রেন্স হসপিটালে স্থানান্তর করা হয়। তিন মাসের মধ্যেই তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র থেকে সরিয়ে নেওয়ার মতো যথেষ্ট ভাল হয়ে উঠে।

এমনকি ভেন্টিলেটরের সহায়তা ছাড়াই কয়েক ঘণ্টা শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারায় তার পরিবারে আশার আলো জ্বলে উঠে। তাফিদার বয়স এখন ৭ বছর এবং এখনও তাকে গাসলিন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

তার পরিবারের পক্ষ থেকে ডেইলি মেইলকে বলা হয়, “যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের হতাশার বাণী উপেক্ষা করে তার উন্নতি হচ্ছে।”   

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইতালির চিকিৎসকরা অবশ্য কখনোই তার সেরে উঠার বিষয়ে নিশ্চয়তা দিতে পারেননি। তারা কেবল আরও সময় নিয়ে দেখছেন তাফিদা তার অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে কি না।

তাফিদা সেরে উঠছে এবং শিগগিরই আরও বিস্তারিত প্রকাশিত হবে জানিয়ে রোববার রাতে পূর্ব লন্ডনের নিউহ্যামে ৪১ বছর বয়সী সেলিনা বেগম ডেইলি মেইলকে বলেন, “সে ভাল হয়ে উঠছে।”

তাফিদার এই গল্প তাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে ‘তাফিদা রাকীব ফাউন্ডেশন’ নামে নতুন একটি দাতব্য সংগঠন গড়ে তুলতে। মস্তিস্কে আঘাত পাওয়া শিশুদের চিকিৎসায় একটি চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তুলতে আগামী ২২ মার্চ থেকে একটি ক্যাম্পেইন শুরু করতে যাচ্ছে সংগঠনটি।   

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই প্রকল্পে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন রয়্যাল সোসাইটি অব মেডিসেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও প্যালিয়েটিভ মেডিসিনের অধ্যাপক ব্যারনেস ফিনলে।

তিনি বলেন, “কেউই ভবিষ্যৎ বলতে পারে না—চিকিৎসা সংক্রান্ত অনুমান হচ্ছে সম্ভাব্যতার সেরা শিল্প। কোনো শিশুর মস্তিষ্কে আঘাত থাকলে বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পুনর্বাসনের মাধ্যমেই কেবল উন্নতি সম্ভব।

“এটা ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব না। প্রত্যেকটি শিশুকে আমাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সুযোগ দেওয়া উচিত, যাতে তারা সেরে উঠে সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পাবে।”

কমপেক্ষ ২০ জন রোগীর ধারণক্ষমতাসম্পন্ন পেডিয়াট্রিক নিউরোলজিক্যাল রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার করতে চায় তাফিদা রাকীব ফাউন্ডেশন। যেখানে দুর্ঘটনায় কিংবা গুরুতর অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হবে।

সেলিনা বেগম বলেন, “আমাদের যে কারও ক্ষেত্রে যে কোনো সময় যে কোনো কিছুই ঘটতে পারে। আমার তাফিদার মতো আপনার সন্তানেরও মস্তিষ্কে জখম হতে পারে। এটা অপ্রত্যাশিতভাবেই ঘটতে পারে।

“তাফিদার মা হিসেবে আমার কষ্টকর এক অভিজ্ঞতা হয়েছে এবং এই অন্ধকারে আমি আশা দেখাতে চাই।”